ইন্টারনেট, ফাইবার অপটিক, স্যাটেলাইট| Internet BD

আর্থ-স্টেশন ও ডিশ অ্যান্টেন

ইন্টারনেট কি? বিশ্বজুড়ে তথ্যের মহাসড়ক সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

বিশ্বজুড়ে তথ্য বা ইনফরমেশন সহজে এবং কম খরচে বিনিময় করার অভিনব ব্যবস্থার নামই ইন্টারনেট। এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষা মাধ্যম ও তথ্য বিনিময়ের প্রধান উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই আজ ইনফরমেশন টেকনোলজি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ইন্টারনেট আসলে কী ধরনের নেটওয়ার্ক?

ইন্টারনেট হলো একাধিক কম্পিউটারের এমন একটি সংযোগ, যা টেলিফোন লাইন বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একে অপরের সাথে জড়িত। এটি একটি পৃথিবী-বিস্তৃত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক।

যেখানেই টেলিফোন লাইন বা মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকবে, সেখানেই একটি কম্পিউটারকে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত করা সম্ভব।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আজ সুদূর মফস্বল থেকেও ইন্টারনেটের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাচ্ছে।
যেই মুহূর্তে আপনি আপনার মডেম বা রাউটারের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করেন, আপনার কম্পিউটারটিও বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত এই জালের একটি অংশ হয়ে যায়।

ইন্টারনেট যেভাবে কাজ করে (সার্ভার ও ই-মেইল)

ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের ফাইল মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাঠানো যায়। এর একটি বড় উদাহরণ হলো ই-মেইল (E-mail)

আপনি যখন আপনার কোনো বন্ধুকে মেইল করেন, সেটি সরাসরি তার কম্পিউটারে না গিয়ে প্রথমে একটি সুপারকম্পিউটার বা সার্ভারে জমা হয়। যখনই আপনার বন্ধু ইন্টারনেট সংযোগ চালু করবেন, তখনই সেই সার্ভার থেকে লেখাটি তার কম্পিউটারে পৌঁছে যাবে। এই সুপারকম্পিউটার সার্ভারগুলোই মূলত ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ইন্টারনেটে যুক্ত হতে যা প্রয়োজন

ইন্টারনেট দুনিয়ায় প্রবেশ করতে হলে আপনার কয়েকটি বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে:

  • কম্পিউটার বা স্মার্টফোন: তথ্য দেখার জন্য একটি ডিসপ্লে সমৃদ্ধ ডিভাইস।
  • মডেম বা রাউটার: এটি আপনার কম্পিউটারকে টেলিফোন লাইন বা নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করবে।
  • ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP): ইন্টারনেটের সংযোগ দেয় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে অনেক দেশে ইন্টারনেট সেবা অনেক সস্তা হয়ে গেছে। সার্ভিস প্রোভাইডাররা এখন শুধু মাসিক ফি নয়, বরং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও তাদের আয় নিশ্চিত করে থাকে।

ইন্টারনেটের সুবিধা ও অসুবিধা

যেকোনো বড় আবিষ্কারের মতোই ইন্টারনেটের যেমন বিশাল সুফল রয়েছে, তেমনি কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে।

সুবিধা: সেকেন্ডের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন, তথ্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার এবং অনলাইনে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
অসুবিধা ও ঝুঁকি: ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজেই অশ্লীলতা বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি নতুন প্রজন্মের নৈতিক ও মানসিক গঠনে হুমকিস্বরূপ হতে পারে যদি সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করা যায়।

যোগাযোগ স্যাটেলাইট কি এবং এটি কিভাবে কাজ করে?

আজকাল টেলিফোন, টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের সিগন্যাল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে মহাকাশে স্থাপিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। এই বিশেষ কৃত্রিম উপগ্রহকেই বলা হয় কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ স্যাটেলাইট। এটি আধুনিক বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত করেছে।

জিও-স্টেশনারী কক্ষপথ ও এর রহস্য

যোগাযোগ স্যাটেলাইট মূলত মহাকাশে জিও-স্টেশনারী (Geostationary) কক্ষপথে অবস্থান করে। এই কক্ষপথটি পৃথিবীর আহ্নিক গতির সাথে মিল রেখে আবর্তিত হয়।

স্থির অবস্থান: যদি বাংলাদেশের উপরে একটি স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়, তবে সেটি সবসময় বাংলাদেশের উপরেই থাকবে। কারণ, পৃথিবী যে গতিতে ঘুরছে, স্যাটেলাইটটিও ঠিক একই গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।
ইতিহাস: প্রখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্ক ১৯৪৫ সালে প্রথম এই জিও-স্টেশনারী কক্ষপথের ধারণা দেন, যা আজকের উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ভিত্তি।

উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থা যেভাবে কাজ করে

একটি যোগাযোগ স্যাটেলাইটের ভেতরে মূলত রেডিও রিসিভার, ট্রান্সমিটার এবং শক্তিশালী অ্যান্টেনা থাকে। এর কাজের প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

  • সিগন্যাল গ্রহণ: পৃথিবী থেকে পাঠানো রেডিও সিগন্যাল স্যাটেলাইটের রিসিভার অ্যান্টেনা গ্রহণ করে।
  • অ্যামপ্লিফিকেশন: দুর্বল সিগন্যালটিকে স্যাটেলাইট তার ভেতরে উন্নতমানের যন্ত্রাংশের মাধ্যমে শক্তিশালী করে তোলে।
  • পুনঃপ্রেরণ: শক্তিশালী সিগন্যালটি পুনরায় পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্টেশনের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
  • শক্তির উৎস: প্রতিটি স্যাটেলাইটের মূল শক্তির উৎস হলো বিশাল সব সোলার সেল, যা সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে।

আর্থ-স্টেশন ও ডিশ অ্যান্টেন

স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ রাখতে পৃথিবীতে অন্তত একটি প্রধান স্টেশন বা আর্থ-স্টেশন থাকা জরুরি। এখানে সাধারণত ৩০ মিটার পর্যন্ত বিশাল ব্যাসের রিসিভার অ্যান্টেনা এবং শক্তিশালী রেডিও ট্রান্সমিটার থাকে। এছাড়া আমাদের বাড়িতে থাকা ছোট ছোট ডিশ অ্যান্টেনাগুলো মহাকাশ থেকে আসা এই সিগন্যাল সরাসরি গ্রহণ করে টিভি পর্দায় ছবি ও শব্দ পৌঁছে দেয়।

সিগন্যালের গতি ও সময়

মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মহাকাশে সিগন্যাল গিয়ে আবার ফিরে আসতে দেরি হয় না কেন? এর কারণ হলো:

ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল আলোর গতিতে চলে, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,৮৬,০০০ মাইল। পৃথিবী থেকে স্যাটেলাইটের দূরত্ব কয়েকশ মাইল হওয়ায় এই যাতায়াতে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ মাত্র সময় লাগে, যা আমরা বুঝতে পারি না। তবে দূরত্ব বাড়লে সময়ও বাড়ে। যেমন মঙ্গলগ্রহ থেকে কোনো সিগন্যাল পৃথিবীতে আসতে ২০ মিনিট সময় লাগে।

ফাইবার অপটিক্স: আলোক তরঙ্গে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন বিপ্লব

অপেক্ষাকৃত নতুন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এক যোগাযোগ প্রযুক্তির নাম হলো ফাইবার অপটিক্স। চুলের মতো সরু কাঁচের তন্তুর ভেতর দিয়ে আলোর গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করার এই প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট ও টেলিকম ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

ফাইবার অপটিক্স যেভাবে কাজ করে

ফাইবার অপটিক্স মূলত পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) নীতিতে কাজ করে। চুলের মতো পাতলা কাঁচের টিউবের ভেতর দিয়ে আলো প্রবাহিত করার সময় তা বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না।

রিফ্লেকটিভ ইনডেক্স: ফাইবার কাঁচের রিফ্লেকটিভ ইনডেক্স আলোর তুলনায় অনেক বেশি থাকে। বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, আলোর রিফ্লেকটিভ ইনডেক্স যদি প্রবাহিত মাধ্যমের চেয়ে কম হয়, তবে আলো সেই মাধ্যম থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
আলোর প্রতিফলন: ফাইবার কাঁচের ভেতরের দেয়ালগুলো আয়নার মতো কাজ করে। ফলে আলো দেয়ালে বাধা পেয়ে বারবার প্রতিফলিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তথ্য পৌঁছে দেয়।

আলোক তরঙ্গে তথ্য রূপান্তর

যেকোনো তথ্যকে প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনটি ভিন্ন শক্তিতে রূপান্তর করা যায়: ইলেকট্রিক (কারেন্ট), ইলেকট্রোম্যাগনেটিক (রেডিও ওয়েভ) এবং আলো। ফাইবার অপটিক্স পদ্ধতিতে আমাদের অডিও, ভিডিও বা অন্যান্য ডাটা সিগন্যালকে প্রথমে বিশেষ ডিভাইসের মাধ্যমে আলোক তরঙ্গে রূপান্তর করা হয়। এরপর সেই আলোক তরঙ্গকে ফাইবার ক্যাবলের ভেতর দিয়ে দ্রুতগতিতে প্রেরণ করা হয়।

ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য

যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক্স ব্যবহারের অনেক সুবিধা রয়েছে:

  • বিশাল ব্যান্ডউইথ: এটি সাধারণ তামা বা কপার তারের তুলনায় অনেক বেশি ডাটা বহন করতে পারে।
  • গতি: যেহেতু আলো ব্যবহার করা হয়, তাই তথ্যের গতি থাকে অবিশ্বাস্য রকমের বেশি।
  • নিরাপত্তা: ফাইবার অপটিক্স ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফারেন্স (EMI) দ্বারা প্রভাবিত হয় না, ফলে তথ্য থাকে সুরক্ষিত।
  • দূরত্ব: সিগন্যাল অনেক দূর পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই পৌঁছাতে পারে।

আমার শেষ কথা

ইন্টারনেট ইনফরমেশন টেকনোলজিকে সর্বসাধারণের নাগালে এনে দিয়েছে। তবে এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে এবং সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করলেই আমরা এর প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবো। নিয়মিত প্রযুক্তি টিপস ও তথ্য পেতে ভিজিট করুন TechSohag.Com। ধন্যবাদ!

সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহারই বদলে দিতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ।

Previous Post Next Post

Contact Form